পশ্চিমবঙ্গের ছাত্রছাত্রীদের জন্য ‘নবান্ন স্কলারশিপ’ (যা ‘উত্তরকন্যা স্কলারশিপ’ নামেও পরিচিত) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি উদ্যোগ। মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে এই বৃত্তি প্রদান করা হয়। যেসব মেধাবী শিক্ষার্থী স্বামী বিবেকানন্দ স্কলারশিপের (SVMCM) যোগ্যতা অর্জন করতে পারেন না, তাঁদের জন্যই মূলত এই সুযোগ। ২০২৬ সালেও এই বৃত্তি রাজ্যের হাজার হাজার পড়ুয়ার মুখে হাসি ফোটাতে চলেছে। তাহলে চলুন জেনে নিই নবান্ন স্কলারশিপ ২০২৬-এর সমস্ত খুঁটিনাটি।
নবান্ন স্কলারশিপ ২০২৬ কী এবং কেন আলাদা?
নবান্ন স্কলারশিপ মূলত পশ্চিমবঙ্গের মাধ্যমিক (১০ম) পাস থেকে শুরু করে স্নাতকোত্তর (পিজি) পর্যন্ত সকল স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত। এটি একটি এককালীন বৃত্তি (one-time scholarship), যেখানে নির্বাচিত পড়ুয়াদের ১০,০০০ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। বিশেষত যাঁদের পরিবারের আয় সীমিত অথচ পড়াশোনায় ফলাফল ভালো, কিন্তু অন্যান্য বড় বৃত্তির জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চ নম্বর নেই, তাঁদের জন্য এটি একটি দুর্দান্ত সুযোগ। কারণ এই বৃত্তির জন্য ন্যূনতম ৫০% নম্বরই যথেষ্ট।

যোগ্যতা: কারা আবেদন করতে পারবেন?
নবান্ন স্কলারশিপ ২০২৬-এর জন্য আবেদনের যোগ্যতা নিম্নরূপ:
শিক্ষাগত যোগ্যতা
আবেদনকারীকে নিচের যেকোনো একটি স্তরে পড়তে হবে এবং সংশ্লিষ্ট পরীক্ষায় নির্দিষ্ট নম্বর পেতে হবে:
| শিক্ষাগত স্তর | প্রয়োজনীয় নম্বর (মোটের মধ্যে) |
|---|---|
| মাধ্যমিক (১০ম) পাস | ৫০% – ৫৯.৯% |
| উচ্চমাধ্যমিক (১২শ) পাস | ৫০% – ৫৯.৯% |
| স্নাতক (গ্রাজুয়েশন) | ৫০% – ৫২.৯% |
গুরুত্বপূর্ণ: ৬০% বা তার বেশি নম্বর থাকলে এই বৃত্তির জন্য আবেদন করা যাবে না, কারণ সেক্ষেত্রে স্বামী বিবেকানন্দ স্কলারশিপের জন্য আবেদন করার কথা বলা হয়েছে।
আর্থিক যোগ্যতা
-
পরিবারের বার্ষিক আয় ১,২০,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে হবে।
-
আয়ের প্রমাণ হিসেবে বৈধ আয় শংসাপত্র জমা দিতে হবে।
অন্যান্য শর্তাবলী
-
আবেদনকারীকে পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে।
-
পশ্চিমবঙ্গের কোনো স্বীকৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বর্তমানে পড়তে হবে।
-
আবেদনকারী অন্য কোনো কেন্দ্রীয় বা রাজ্য সরকারি বৃত্তির সুবিধা পাচ্ছেন না, এমন হতে হবে।
টাকার পরিমাণ: কত টাকা পাওয়া যাবে?
নির্বাচিত প্রতিটি শিক্ষার্থীকে শিক্ষাবর্ষপ্রতি ১০,০০০ টাকা করে এককালীন দেওয়া হয়। এই অর্থ সরাসরি শিক্ষার্থীর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা করা হয়।
প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট (নথিপত্র)
আবেদন শুরুর আগে নিচের ডকুমেন্টগুলো স্ক্যান করে (JPEG বা PDF ফরম্যাটে) রেডি রাখুন:
-
শিক্ষাগত নথি: শেষ পরীক্ষার মার্কশিট (যেমন: মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিকের মার্কশিট)।
-
ভর্তির নথি: বর্তমান কোর্সে ভর্তির রশিদ বা ফি জমার স্লিপ।
-
আয়ের প্রমাণ: পরিবারের বার্ষিক আয়ের শংসাপত্র (বিডিও বা এসডিও অফিস থেকে ইস্যুকৃত)।
-
পরিচয়পত্র: আধার কার্ড (আবেদনকারীর)।
-
ব্যাঙ্কের বিবরণ: ব্যাঙ্ক পাসবুকের প্রথম পাতার কপি (যাতে অ্যাকাউন্ট নম্বর ও IFSC কোড স্পষ্ট দেখা যায়)।
-
সুপারিশপত্র: স্থানীয় বিধায়ক (এমএলএ) বা সাংসদ (এমপি)-এর সুপারিশপত্র (বাধ্যতামূলক নয়, তবে আবেদন জোরদার করে)।
-
স্ব-ঘোষণাপত্র: একটি সেলফ ডিক্লারেশন যাতে উল্লেখ থাকে যে আপনি অন্য কোনো বৃত্তি গ্রহণ করছেন না এবং আপনার পড়ার স্তরের বিবরণ।
-
ছবি: সাম্প্রতিক পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি।
আবেদন পদ্ধতি ২০২৬ (ধাপে ধাপে)
নবান্ন স্কলারশিপে আবেদন প্রক্রিয়া মূলত অনলাইনভিত্তিক। নিচের ধাপগুলো সাবধানে অনুসরণ করুন:
ধাপ ১: অফিসিয়াল পোর্টালে প্রবেশ করুন
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে যান। ওয়েবসাইটের ঠিকানাটি সহজেই গুগল বা অন্য সার্চ ইঞ্জিনে সার্চ করে পেয়ে যাবেন। সেখানে গিয়ে ‘নবান্ন স্কলারশিপ’ বা ‘শিক্ষা সহায়তা’ সংক্রান্ত অপশনটি খুঁজে নিন।
ধাপ ২: স্কলারশিপ বিভাগ নির্বাচন করুন
হোমপেজে ‘নবান্ন স্কলারশিপ’ বা ‘আবেদন করুন’ বাটনে ক্লিক করুন। সরাসরি স্কলারশিপ পোর্টালে চলে যাবেন।
ধাপ ৩: নিবন্ধন করুন
আপনি যদি নতুন হন, তাহলে ‘নতুন নিবন্ধন’ বা ‘রেজিস্ট্রেশন’ অপশনে ক্লিক করুন। আপনার বৈধ মোবাইল নম্বর ও ইমেল আইডি দিন। ওটিপি (OTP) দিয়ে নম্বর ভেরিফাই করুন এবং একটি পাসওয়ার্ড তৈরি করুন।
ধাপ ৪: আবেদন ফর্ম পূরণ করুন
লগইন করে আবেদন ফর্মটি খুলুন। নিচের তথ্যগুলো খুব সঠিকভাবে দিন:
-
ব্যক্তিগত তথ্য (নাম, পিতার নাম, জন্মতারিখ, ঠিকানা)।
-
শিক্ষাগত যোগ্যতা (পরীক্ষার নাম, বোর্ড, বছর, প্রাপ্ত নম্বর)।
-
বর্তমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম ও ঠিকানা।
-
ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের বিবরণ।
-
পারিবারিক আয়ের বিবরণ।
ধাপ ৫: ডকুমেন্ট আপলোড করুন
পূর্বে রেডি করে রাখা সমস্ত প্রয়োজনীয় নথিপত্র সঠিক জায়গায় আপলোড করুন। নিশ্চিত করুন যে ডকুমেন্টের সাইজ ও ফরম্যাট সঠিক আছে। সাধারণত প্রতিটি ফাইলের সাইজ ৫০০ কেবি থেকে ১ এমবি-র মধ্যে রাখার চেষ্টা করুন।
ধাপ ৬: চূড়ান্ত জমা দিন ও কনফার্মেশন নিন
সব তথ্য ও ডকুমেন্ট ঠিক থাকলে ‘সাবমিট’ বাটনে ক্লিক করুন। সাবমিট করার আগে একবার সব তথ্য ভালো করে দেখে নিন, কারণ একবার জমা দিলে সংশোধনের সুযোগ থাকে না। সাবমিট করার সঙ্গে সঙ্গেই একটি কনফার্মেশন পেজ স্ক্রিনে আসবে এবং আপনার রেজিস্টার্ড মোবাইল নম্বরে একটি এসএমএস যাবে। এই কনফার্মেশন পেজটি প্রিন্ট করে নিন বা PDF সেভ করে রাখুন।
বিকল্প পদ্ধতি: কিছু কিছু ক্ষেত্রে অফলাইন আবেদনও গ্রহণ করা হয়। সেক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ফরম পূরণ করে সমস্ত নথির জেরক্স সংযুক্ত করে জেলার দম্পতি অফিসে বা সংশ্লিষ্ট স্কলারশিপ নোডাল অফিসে জমা দিতে হবে।
গুরুত্বপূর্ণ তারিখ ও সময়সীমা
২০২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য নবান্ন স্কলারশিপের আবেদন প্রক্রিয়া সাধারণত জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত চলে। তাই দেরি না করে দ্রুত আবেদন করে ফেলুন। নির্দিষ্ট শেষ তারিখের জন্য অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে নিয়মিত নজর রাখুন।
নবান্ন ও অন্যান্য বৃত্তির পার্থক্য
| বৈশিষ্ট্য | নবান্ন স্কলারশিপ | মেধাশ্রী স্কলারশিপ | স্বামী বিবেকানন্দ (SVMCM) |
|---|---|---|---|
| প্রদানকারী | মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল | পশ্চিমবঙ্গ সরকার | পশ্চিমবঙ্গ সরকার |
| টাকার পরিমাণ | ১০,০০০ টাকা (এককালীন) | ১০,০০০ – ১২,০০০ টাকা/বছর | শিক্ষা স্তরভেদে ভিন্ন |
| প্রয়োজনীয় নম্বর | ৫০% – ৫৯.৯% | ৭৫% (সাধারণ) | উচ্চমাধ্যমিকে ৭৫%+ |
| আয়ের সীমা | ১.২ লক্ষ টাকা/বছর | ২.৫ লক্ষ টাকা/বছর | ৬ লক্ষ টাকা/বছর পর্যন্ত |
| স্তর | ১০ম থেকে পিজি | ১২শ ও স্নাতক প্রথম বর্ষ | ১২শ থেকে পিএইচডি |
সতর্কীকরণ ও পরামর্শ
-
কোনো আবেদন ফি নেই: নবান্ন স্কলারশিপে আবেদন করতে কোনো টাকা লাগে না। কেউ টাকা চাইলে জালিয়াতি বুঝবেন এবং সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাবেন।
-
সঠিক তথ্য দিন: আয় বা শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে কোনো মিথ্যা তথ্য দিলে আবেদন বাতিল হবে এবং ভবিষ্যতের জন্যও অযোগ্য ঘোষণা করা হতে পারে।
-
সুপারিশপত্র জোগাড় করুন: এমএলএ বা এমপির সুপারিশপত্র বাধ্যতামূলক না হলেও এটি আপনার আবেদনকে শক্তিশালী করে। তাই সম্ভব হলে জোগাড় করে নিন।
-
ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সক্রিয় রাখুন: বৃত্তির টাকা আসবে আপনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে। তাই অ্যাকাউন্টটি সক্রিয় ও সঠিকভাবে সীমাবদ্ধ রাখুন। নিশ্চিত করুন যে অ্যাকাউন্টটি আধারের সঙ্গে লিঙ্ক করা আছে।
-
একাধিক আবেদন নয়: একই শিক্ষার্থী একাধিকবার আবেদন করলে বা একাধিক বৃত্তির জন্য আবেদন করলে তাঁর আবেদন বাতিল হতে পারে।
উপসংহার
নবান্ন স্কলারশিপ ২০২৬ পশ্চিমবঙ্গের সেই সব মেধাবী কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ছাত্রছাত্রীদের জন্য এক অমূল্য সুযোগ, যাঁরা উচ্চনম্বরের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন। মাত্র ৫০% নম্বর এবং নির্দিষ্ট আয়সীমার মধ্যে পড়লেই আপনি এই বৃত্তির জন্য আবেদনের যোগ্য। তাই আর দেরি না করে আপনার নথিপত্র গুছিয়ে ফেলুন এবং দ্রুত অনলাইনে আবেদন করুন। এই ছোট্ট আর্থিক সাহায্য আপনার শিক্ষার পথকে অনেকটাই সহজ করে দিতে পারে।
প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা:
আবেদনের জন্য অফিসিয়াল ওয়েবসাইটটির নাম মনে রাখবেন। এটি ইন্টারনেটে সার্চ করে সহজেই পেয়ে যাবেন। আবেদন সংক্রান্ত যেকোনো সমস্যায় আপনার জেলার মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল অফিস বা স্কলারশিপ নোডাল অফিসে যোগাযোগ করুন।



Leave a Reply
View Comments