পশ্চিমবঙ্গের মেধাবী ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ছাত্রছাত্রীদের জন্য সরকারি সহায়তার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো বিকাশ ভবন স্কলারশিপ। এটি আসলে স্বামী বিবেকানন্দ মেরিট-কাম-মিনস স্কলারশিপ (SVMCM) নামেই বেশি পরিচিত। এই বৃত্তির আওতায় রাজ্যের যোগ্য শিক্ষার্থীরা উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক স্তরে পড়ার জন্য আর্থিক সাহায্য পেয়ে থাকেন। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য আবেদন প্রক্রিয়া চলছে এবং শেষ তারিখ সম্প্রতি বাড়ানো হয়েছে। চলুন জেনে নিই এই বৃত্তির বিস্তারিত তথ্য।
বিকাশ ভবন স্কলারশিপ কী?
বিকাশ ভবন স্কলারশিপ বা স্বামী বিবেকানন্দ মেরিট-কাম-মিনস স্কলারশিপ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উচ্চশিক্ষা দপ্তর কর্তৃক পরিচালিত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। এই বৃত্তির মূল লক্ষ্য রাজ্যের মেধাবী কিন্তু আর্থিকভাবে দুর্বল ছাত্রছাত্রীদের উচ্চশিক্ষায় উৎসাহিত করা এবং তাদের পড়ার খরচ বহনে সহায়তা করা। এটি একটি মেধা ও আর্থিক ভিত্তিক বৃত্তি, যেখানে প্রার্থীর পূর্ববর্তী পরীক্ষার ফলাফল ও পরিবারের আয় উভয়ই বিবেচনা করা হয়।
“বিকাশ ভবন” নামটি মূলত পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সচিবালয়ের নাম হলেও সাধারণ ভাষায় এই বৃত্তি প্রকল্পটিকেই অনেকে বিকাশ ভবন স্কলারশিপ বলে থাকেন। প্রকৃত নাম স্বামী বিবেকানন্দ মেরিট-কাম-মিনস স্কলারশিপ।
আবেদনের শেষ তারিখ (গুরুত্বপূর্ণ আপডেট)
যারা এই বৃত্তির জন্য আবেদন করতে চান, তাঁদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আপডেট রয়েছে। বৃত্তির জন্য আবেদনের শেষ তারিখ আগামী ৩১ মে ২০২৬ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তাই যারা এখনও আবেদন করেননি, তাঁরা এই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ফেলুন। দেরি না করে আজই আবেদন করা উচিত।
উল্লেখ্য: এই বৃত্তির আবেদন প্রক্রিয়া স্বামী বিবেকানন্দ স্কলারশিপের অফিসিয়াল পোর্টালের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে।

বৃত্তির পরিমাণ ও সুবিধা
বিকাশ ভবন স্কলারশিপের আওতায় শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষার স্তর অনুযায়ী নিম্নলিখিত সুবিধা পাবেন:
| শিক্ষার স্তর | বৃত্তির পরিমাণ |
|---|---|
| উচ্চমাধ্যমিক (Class 11 & 12) | বছরে ১০,০০০ টাকা |
| স্নাতক (সাধারণ ডিগ্রি) | বছরে ১২,০০০ টাকা |
| স্নাতক (প্রফেশনাল কোর্স – যেমন ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিকেল) | বছরে ১৫,০০০ টাকা |
বৃত্তির অর্থ শিক্ষার্থীদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে DBT পদ্ধতিতে সরাসরি দুই কিস্তিতে পাঠানো হয়। সাধারণত জানুয়ারি ও জুলাই মাসে এই টাকা দেওয়া হয়।
যোগ্যতা: কারা আবেদন করতে পারবেন?
১. আবাসিক যোগ্যতা
-
প্রার্থীকে পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে।
-
পশ্চিমবঙ্গের কোনো স্বীকৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়তে হবে।
২. শিক্ষাগত যোগ্যতা
-
উচ্চমাধ্যমিক স্তর (ক্লাস ১১ ও ১২): মাধ্যমিক (১০ম) পরীক্ষায় ন্যূনতম ৭৫% নম্বর থাকতে হবে (সংরক্ষিত শ্রেণির SC/ST/OBC-এর জন্য ন্যূনতম ৬০%)।
-
স্নাতক স্তর (সাধারণ ও প্রফেশনাল): উচ্চমাধ্যমিক (১২ম) পরীক্ষায় ন্যূনতম ৭৫% নম্বর থাকতে হবে (সংরক্ষিত শ্রেণির জন্য ন্যূনতম ৬০%)।
৩. আর্থিক যোগ্যতা
-
পরিবারের বার্ষিক আয় ২.৫ লক্ষ টাকার নিচে হতে হবে।
-
আয়ের প্রমাণ হিসেবে বৈধ আয় শংসাপত্র (ইনকাম সার্টিফিকেট) জমা দিতে হবে।
৪. অন্যান্য শর্ত
-
কন্যাশ্রী প্রাপক শিক্ষার্থীরাও এই বৃত্তির জন্য আবেদনের যোগ্য।
-
পূর্ববর্তী শিক্ষাবর্ষে কোনো ব্যাকলগ থাকলে আবেদন বাতিল হতে পারে।
-
প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরাই এই বৃত্তির জন্য আবেদনের যোগ্য।
আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট
আবেদন শুরুর আগে নিচের ডকুমেন্টগুলো স্ক্যান করে (JPEG/PDF ফরম্যাটে) রেডি রাখুন:
| ক্রম | নথির নাম |
|---|---|
| ১ | সাম্প্রতিক পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি (সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডে) |
| ২ | স্বাক্ষর (সাদা কাগজে কালো কালি দিয়ে) |
| ৩ | মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের মার্কশিট ও সার্টিফিকেট |
| ৪ | আধার কার্ড (আবেদনকারীর) |
| ৫ | পরিবারের বার্ষিক আয়ের শংসাপত্র (ইনকাম সার্টিফিকেট) |
| ৬ | বর্তমান প্রতিষ্ঠানের ভর্তির রশিদ ও আইডি কার্ড |
| ৭ | ব্যাঙ্ক পাসবুকের প্রথম পৃষ্ঠার কপি (নাম, অ্যাকাউন্ট নম্বর ও IFSC কোডসহ) |
| ৮ | জাতি শংসাপত্র (SC/ST/OBC – প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) |
| ৯ | আবাসিক শংসাপত্র (স্থানীয় পঞ্চায়েত/পুরসভা থেকে) |
| ১০ | বোনাফাইড সার্টিফিকেট (প্রতিষ্ঠানের প্রধান থেকে) |
আবেদন পদ্ধতি ২০২৬ (ধাপে ধাপে)
বিকাশ ভবন স্কলারশিপের আবেদন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক। নিচের ধাপগুলো সাবধানে অনুসরণ করুন:
ধাপ ১: অফিসিয়াল পোর্টালে যান
আপনার ব্রাউজারে স্বামী বিবেকানন্দ স্কলারশিপের অফিসিয়াল পোর্টালে যান। পোর্টালটির ঠিকানা স্মরণ রাখুন——ইন্টারনেটে সার্চ করে সহজেই পেয়ে যাবেন।
ধাপ ২: নিবন্ধন করুন
ওয়েবসাইটে গিয়ে ‘নিবন্ধন’ বা ‘রেজিস্ট্রেশন’ অপশনে ক্লিক করুন। আপনার সক্রিয় মোবাইল নম্বর ও বৈধ ইমেল আইডি দিন। একটি ওটিপি (OTP) আসবে, তা দিয়ে নম্বর ভেরিফাই করুন। নিবন্ধন সফল হলে একটি ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড পাবেন।
ধাপ ৩: লগইন করে ফর্ম পূরণ করুন
নিবন্ধনের পর প্রাপ্ত আইডি ও পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করুন। আবেদন ফর্মটি খুলে নিচের তথ্যগুলো সঠিকভাবে দিন:
-
ব্যক্তিগত তথ্য (নাম, পিতার নাম, মাতার নাম, জন্ম তারিখ, ঠিকানা)
-
শিক্ষাগত যোগ্যতা (পরীক্ষার নাম, বোর্ড, বছর, প্রাপ্ত নম্বর)
-
বর্তমান প্রতিষ্ঠানের বিবরণ (কলেজ/স্কুলের নাম, ঠিকানা)
-
ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের বিবরণ (অ্যাকাউন্ট নম্বর, IFSC কোড)
-
পারিবারিক আয় ও ক্যাটাগরি সম্পর্কিত তথ্য
ধাপ ৪: ডকুমেন্ট আপলোড করুন
উপরে তালিকাভুক্ত সমস্ত নথিপত্র স্ক্যান করে সঠিক ফরম্যাট ও সাইজে (সাধারণত ৫০০ কেবির মধ্যে) আপলোড করুন।
ধাপ ৫: ফর্ম জমা দিন ও রসিদ সংগ্রহ করুন
সব তথ্য ও নথি সঠিক হয়েছে কিনা ভালো করে যাচাই করে ‘সাবমিট’ বাটনে ক্লিক করুন। সাবমিট করার পর একটি কনফার্মেশন পেজ দেখাবে। এই পেজটি ডাউনলোড করে প্রিন্ট করে রাখুন। এতে একটি অ্যাপ্লিকেশন আইডি থাকবে, যা ভবিষ্যতে আবেদনের অবস্থা জানতে কাজে লাগবে।
ধাপ ৬: ইনস্টিটিউট ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করুন
ফর্ম জমা দেওয়ার পর আপনার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নোডাল অফিসার থেকে যাচাই করা প্রয়োজন। তাই ফর্ম জমা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আপনার কলেজ বা স্কুলের অধ্যক্ষ/প্রিন্সিপাল অফিসে যোগাযোগ করে ইনস্টিটিউট ভেরিফিকেশন করিয়ে দিন। এটি বাধ্যতামূলক। ভেরিফিকেশন না হলে আবেদন বাতিল বলে গণ্য হবে।
তথ্য যাচাইকরণ ও টাকা প্রাপ্তির প্রক্রিয়া
আবেদন ও ইনস্টিটিউট ভেরিফিকেশন সম্পন্ন হওয়ার পর জেলা ও রাজ্য স্তরে তথ্য যাচাই করা হবে। আবেদন করার পর প্রায় নভেম্বর বা ডিসেম্বর মাসে বৃত্তির টাকা দেওয়া শুরু হয়। টাকা সরাসরি DBT পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়।
আপনার আবেদনের অবস্থা অনলাইনে ‘Track Application’ অপশনে গিয়ে অ্যাপ্লিকেশন আইডি ও জন্মতারিখ দিয়ে জানতে পারবেন।
সতর্কীকরণ ও পরামর্শ
-
কোনো আবেদন ফি নেই: এই বৃত্তির জন্য আবেদন করতে কোনো টাকা লাগে না। এটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। কেউ টাকা চাইলে জালিয়াতি বুঝবেন এবং সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাবেন।
-
সঠিক তথ্য দিন: শিক্ষাগত যোগ্যতা ও আয় সংক্রান্ত কোনো তথ্য গোপন বা মিথ্যা দিলে আবেদন বাতিল হবে এবং ভবিষ্যতের জন্যও অযোগ্য ঘোষণা করা হতে পারে।
-
সময়মতো আবেদন করুন: ৩১ মে ২০২৬ শেষ তারিখ। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন না, কারণ সার্ভার ধীরগতির হতে পারে। আজই আবেদন করে ফেলুন।
-
ইনস্টিটিউট ভেরিফিকেশন নিশ্চিত করুন: ফর্ম জমা দেওয়ার পর কলেজ/স্কুলে যে ভেরিফিকেশন করা প্রয়োজন, তা দ্রুত করিয়ে দিন। অনেকে এই ধাপটি ভুলে যান, ফলে আবেদন বাতিল হয়।
-
ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সক্রিয় রাখুন: টাকা পাওয়ার জন্য ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টটি আধারের সঙ্গে লিঙ্ক করা থাকতে হবে। অ্যাকাউন্ট সক্রিয় আছে কিনা যাচাই করে নিন।
-
মোবাইল নম্বর সক্রিয় রাখুন: আবেদনের সময় যে মোবাইল নম্বর দিয়েছেন, তা সব সময় সক্রিয় রাখুন। ওটিপি ও এসএমএস সেই নম্বরেই আসবে।
সচরাচর জিজ্ঞাস্য (FAQs)
প্রশ্ন ১: বিকাশ ভবন স্কলারশিপের অফিসিয়াল নাম কী?
উত্তর: স্বামী বিবেকানন্দ মেরিট-কাম-মিনস স্কলারশিপ (SVMCM)।
প্রশ্ন ২: আবেদনের শেষ তারিখ কখন?
উত্তর: আবেদনের শেষ তারিখ ৩১ মে ২০২৬ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
প্রশ্ন ৩: কীভাবে আবেদন করতে হবে?
উত্তর: সম্পূর্ণ অনলাইন প্রক্রিয়া। স্বামী বিবেকানন্দ স্কলারশিপের অফিসিয়াল পোর্টালে গিয়ে নিবন্ধন করে আবেদন করতে হবে।
প্রশ্ন ৪: আবেদনের জন্য ন্যূনতম নম্বর কত লাগবে?
উত্তর: সাধারণ শ্রেণির জন্য ৭৫% এবং সংরক্ষিত শ্রেণির জন্য ৬০% নম্বর থাকতে হবে।
প্রশ্ন ৫: কন্যাশ্রী প্রাপকরা কি আবেদন করতে পারবেন?
উত্তর: হ্যাঁ, কন্যাশ্রী প্রাপক শিক্ষার্থীরাও এই বৃত্তির জন্য আবেদন করতে পারবেন।
প্রশ্ন ৬: আবেদন ফি কত?
উত্তর: এই বৃত্তির জন্য কোনো আবেদন ফি নেই। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।
প্রশ্ন ৭: টাকা কখন পাওয়া যায়?
উত্তর: সাধারণত নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে টাকা দেওয়া শুরু হয়।
প্রশ্ন ৮: ইনস্টিটিউট ভেরিফিকেশন না করলে কী হবে?
উত্তর: ইনস্টিটিউট ভেরিফিকেশন বাধ্যতামূলক। না করলে আবেদন বাতিল বলে গণ্য হবে।
উপসংহার
বিকাশ ভবন স্কলারশিপ বা স্বামী বিবেকানন্দ স্কলারশিপ পশ্চিমবঙ্গের মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের জন্য একটি দুর্দান্ত সুযোগ। আর্থিক অনটনকে জয় করে উচ্চশিক্ষা লাভের এটি একটি অন্যতম মাধ্যম। আবেদনের শেষ তারিখ ৩১ মে ২০২৬ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এখনও অনেক সময় আছে, তবে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা না করে আজই প্রস্তুতি শুরু করুন।
আপনার প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করুন, অফিসিয়াল পোর্টালে গিয়ে নিবন্ধন করুন, ফর্ম পূরণ করুন এবং দ্রুত ইনস্টিটিউট ভেরিফিকেশন করিয়ে নিন। সময়মতো আবেদন করলে এবং সব নিয়ম মেনে চললে এই বৃত্তি পাওয়া কঠিন নয়।



Leave a Reply
View Comments