পশ্চিমবঙ্গের প্রবীণ নাগরিকদের জন্য বড় সুখবর। রাজ্যের নতুন সরকার কেন্দ্রীয় সরকারের আয়ুষ্মান ভারত প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা (AB-PMJAY) পুনরায় চালু করার ঘোষণা দিয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় ৭০ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রতিটি প্রবীণ নাগরিক বার্ষিক ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ক্যাশলেস স্বাস্থ্য সুবিধা পাবেন। এর আগে ২০১৮-১৯ সালে এই প্রকল্প কিছুদিন চালু থাকলেও পরে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এখন নতুন সরকার তা আবার চালু করছে। চলুন জেনে নিই কারা এই সুবিধা পাবেন এবং কীভাবে আবেদন করবেন।
আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?
আয়ুষ্মান ভারত প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা (AB-PMJAY) বিশ্বের বৃহত্তম সরকারি স্বাস্থ্য বীমা প্রকল্প। এই প্রকল্পের আওতায় প্রতি পরিবারকে বছরে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ক্যাশলেস হাসপাতালে ভর্তি ও চিকিৎসার সুবিধা দেওয়া হয়। চিকিৎসার খরচ যেমন: ডাক্তারি পরামর্শ, ওষুধ, ডায়াগনস্টিক টেস্ট, আইসিইউ সুবিধা, সার্জারি, হাসপাতালে থাকার খরচ এবং ছাড়ার পর ১৫ দিনের ফলো-আপ চিকিৎসা – সবই এই প্রকল্পের আওতাভুক্ত।
পশ্চিমবঙ্গের জন্য বিশেষ গুরুত্ব হলো, এই কার্ডটি শুধু রাজ্যের মধ্যেই নয়, বরং দেশের যেকোনো তালিকাভুক্ত (empanneled) সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালে ব্যবহার করা যাবে। ফলে গুরুতর অসুস্থতার ক্ষেত্রে অন্য রাজ্যে চিকিৎসা করাতেও কোনো আর্থিক চিন্তা থাকবে না।

কারা এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন?
আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের আওতায় মূলত দুই ধরনের মানুষ সুবিধা পাবেন:
১. প্রবীণ নাগরিক (৭০ বছর বা তার বেশি)
সরকারের নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, ৭০ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রতিটি ভারতীয় নাগরিক এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন। এখানে বিশেষ বিষয় হলো:
-
আয়ের কোনো সীমা নেই – ধনী হোক বা গরিব, সকলেই পাবেন
-
বর্তমান স্বাস্থ্য বীমা থাকলেও আবেদন করা যাবে
-
কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য বীমা প্রকল্প (CGHS, ECHS) থেকে আয়ুষ্মভারতে স্থানান্তরিত হওয়ার সুযোগ আছে
২. অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল পরিবার
এর বাইরে, যে পরিবারগুলি ২০১১ সালের সামাজিক-আর্থিক ও জাতি জরিপে (SECC 2011) চিহ্নিত হয়েছে, তারাও সুবিধা পাবেন। যেমন:
-
গ্রামীণ এলাকায়: যারা কাঁচা ঘরে থাকেন, কোনও প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ সদস্য নেই, বা ভূমিহীন দিনমজুর।
-
শহর এলাকায়: কচরাবাছাইকারী, ঘরকন্নার কাজ করা মহিলা, রাস্তার দোকানদার, রাজমিস্ত্রি, মোচি ইত্যাদি পেশায় যুক্ত ব্যক্তিরা।
চিকিৎসার আওতায় কী কী খরচ কভার হবে?
এই প্রকল্পের আওতায় ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত নিচের খরচগুলি কভার হবে:
| আওতাভুক্ত খরচ | বিবরণ |
|---|---|
| হাসপাতালে ভর্তি খরচ | ভর্তি থেকে ছাড়া পর্যন্ত সব খরচ |
| ডাক্তারি পরামর্শ ও চিকিৎসা | বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ফি |
| ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রী | হাসপাতালে ব্যবহৃত সব ওষুধ ও উপকরণ |
| আইসিইউ ও নন-আইসিইউ সেবা | নিবিড় পরিচর্যা ও সাধারণ ওয়ার্ডের সুবিধা |
| ডায়াগনস্টিক টেস্ট | রক্ত, প্রস্রাব, এক্স-রে, সিটি স্ক্যান ইত্যাদি |
| মেডিকেল ইমপ্ল্যান্ট | প্রয়োজনে কৃত্রিম যন্ত্রপাতি বসানো |
| হাসপাতালে থাকা ও খাবার | রুম চার্জ ও রোগীর খাবার |
| ভর্তির ৩ দিন আগের খরচ | প্রি-হসপিটালাইজেশন খরচ |
| ছাড়ার ১৫ দিন পরের খরচ | পোস্ট-হসপিটালাইজেশন ফলো-আপ যত্ন |
যা কভার হবে না: ওপিডি (OPD) খরচ, কসমেটিক সার্জারি, মাদকাসক্তি পুনর্বাসন ও প্রজনন চিকিৎসা সাধারণত এই প্রকল্পের আওতাভুক্ত নয়।
প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট (নথিপত্র)
আবেদনের সময় নিচের ডকুমেন্টগুলির প্রয়োজন হবে:
-
আধার কার্ড (আবেদনকারীর) – বাধ্যতামূলক
-
ভোটার আইডি কার্ড বা অন্যান্য ঠিকানার প্রমাণ
-
রেশন কার্ড (যদি থাকে)
-
সক্রিয় মোবাইল নম্বর
-
বয়স প্রমাণের নথি (জন্ম সার্টিফিকেট, প্যান কার্ড বা আধার কার্ড)
-
আয় শংসাপত্র (প্রয়োজন হলে – তবে ৭০+ প্রবীণদের জন্য প্রয়োজন নেই)
গুরুত্বপূর্ণ: প্রবীণ নাগরিকদের জন্য আয়ের প্রমাণ বা আয়কর রিটার্নের কোনো প্রয়োজন নেই। শুধু আধার-ভিত্তিক ই-কেওয়াইসি (e-KYC) করলেই হবে।
আবেদন পদ্ধতি (অনলাইন ও অফলাইন)
আয়ুষ্মান ভারত কার্ডের আবেদন প্রক্রিয়া সহজ ও সম্পূর্ণ ডিজিটাল। আপনি অনলাইন বা অফলাইন – উভয় পদ্ধতিতেই আবেদন করতে পারবেন।
অনলাইন পদ্ধতি (ধাপে ধাপে)
ধাপ ১: পোর্টাল বা অ্যাপে যান
আয়ুষ্মান ভারতের অফিসিয়াল পোর্টালে যান। পোর্টালটির নাম মনে রাখুন – এটি pmjay.gov.in বা beneficiary.nha.gov.in। সহজেই গুগল বা অন্য সার্চ ইঞ্জিনে সার্চ করে পেয়ে যাবেন। অথবা, গুগল প্লে স্টোর থেকে ‘Ayushman App’ ডাউনলোড করুন (অ্যান্ড্রয়েড ফোনে)।
ধাপ ২: পাত্রতা যাচাই করুন
পোর্টালের ‘Am I Eligible’ বা ‘I am Eligible’ অপশনে ক্লিক করুন। আপনার মোবাইল নম্বর ও ক্যাপচা কোড দিন। ওটিপি (OTP) দিয়ে নম্বর ভেরিফাই করুন।
ধাপ ৩: রাজ্য ও জেলা নির্বাচন করুন
লগইন করার পর আপনার ‘State’ (পশ্চিমবঙ্গ) এবং ‘District’ নির্বাচন করুন। ‘Sub Scheme’ থেকে PMJAY নির্বাচন করুন।
ধাপ ৪: প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করুন
ফর্মটিতে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য সঠিকভাবে দিন (নাম, জন্মতারিখ, ঠিকানা)।
ধাপ ৫: ই-কেওয়াইসি (e-KYC) সম্পন্ন করুন
‘Do e-KYC’ বাটনে ক্লিক করুন। আধারের সঙ্গে লিঙ্ক করা মোবাইল নম্বরে একটি ওটিপি যাবে। ওটিপি প্রবেশ করান এবং সম্মতি দিন। ই-কেওয়াইসি সফল হলে একটি বার্তা দেখাবে।
ধাপ ৬: কার্ড ডাউনলোড করুন
প্রায় ১৫-২০ মিনিট পর পোর্টাল বা অ্যাপে লগইন করে আপনার ডিজিটাল আয়ুষ্মান কার্ড ডাউনলোড করতে পারবেন।
অফলাইন পদ্ধতি
যাঁরা অনলাইনে আবেদন করতে অসুবিধা বোধ করেন, তাঁদের জন্য অফলাইন ব্যবস্থাও আছে:
ধাপ ১: আপনার নিকটস্থ কমন সার্ভিস সেন্টার (CSC) বা তালিকাভুক্ত হাসপাতালের ‘আয়ুষ্মান মিত্র’ ডেস্কে যান।
ধাপ ২: আপনার আধার কার্ড ও রেশন কার্ড (যদি থাকে) সঙ্গে নিন।
ধাপ ৩: সেন্টারের কর্মী আপনার তথ্য নেবেন এবং ই-কেওয়াইসি সম্পন্ন করবেন।
ধাপ ৪: কাজ শেষে আপনার মোবাইলে এসএমএসের মাধ্যমে ডিজিটাল কার্ড পাওয়ার তথ্য আসবে।
আয়ুষ্মান কার্ড ব্যবহারের পদ্ধতি
কার্ড পাওয়ার পর হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন:
ধাপ ১: তালিকাভুক্ত (empanneled) হাসপাতালে যান এবং ‘আয়ুষ্মান মিত্র’ ডেস্কে আপনার ডিজিটাল কার্ড বা কার্ড নম্বর দেখান।
ধাপ ২: আপনার আধার কার্ড ও ভোটার আইডি জমা দিন।
ধাপ ৩: হাসপাতাল অনলাইনে আপনার পাত্রতা যাচাই করবে।
ধাপ ৪: যাচাই সফল হলে, পূর্বানুমোদন (pre-authorization) নিয়ে ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু হবে।
ধাপ ৫: চিকিৎসা শেষে কোনও টাকা দিতে হবে না – সম্পূর্ণ ক্যাশলেস সুবিধা।
সতর্কীকরণ ও পরামর্শ
-
কোনো আবেদন ফি নেই: আয়ুষ্মান ভারত কার্ড তৈরি করতে কোনো টাকা লাগে না। কেউ টাকা চাইলে জালিয়াতি বুঝবেন এবং সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাবেন।
-
আধার ভিত্তিক ই-কেওয়াইসি বাধ্যতামূলক: কার্ড পেতে হলে অবশ্যই আধার ও মোবাইল নম্বর সক্রিয় ও ভেরিফাই থাকতে হবে।
-
সঠিক তথ্য দিন: নাম ও জন্মতারিখ আধার কার্ডের সঙ্গে হুবহু মিলিয়ে দিন। সামান্য ভুল হলেও আবেদন বাতিল হতে পারে।
-
একাধিক আবেদন নয়: আপনি যদি ইতিমধ্যে এই প্রকল্পের সুবিধাভোগী হয়ে থাকেন, তাহলে নতুন করে আবেদন করবেন না।
-
কার্ড ডাউনলোড করে রাখুন: ডিজিটাল কার্ডটি আপনার ফোনে বা প্রিন্ট কপি রেখে দিন। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সময় এটি দেখাতে হবে।
-
পূর্বের বীমা থাকলে: আপনার যদি আগে থেকে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য বীমা থাকে, তাহলে সেটি থেকেও চিকিৎসা করাতে পারেন। আয়ুষ্মান ভারত অতিরিক্ত সুরক্ষা হিসেবে কাজ করবে।
উপসংহার:
আয়ুষ্মান ভারত কার্ড ২০২৬ পশ্চিমবঙ্গের প্রবীণ নাগরিকদের জন্য এক যুগান্তকারী সুযোগ। ৭০ বছর বয়সের পরে যখন শারীরিক সমস্যা ও চিকিৎসার খরচ বেড়ে যায়, সেই সময় ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনামূল্যে চিকিৎসার সুবিধা অভিভাবকদের জন্য বড় স্বস্তি নিয়ে আসবে। কোনো আয়ের বাধা নেই, বর্তমান বীমা থাকলেও সমস্যা নেই। তাই আপনার পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের জন্য এখনই আবেদন করুন। অ্যাপটি ডাউনলোড করে বা নিকটস্থ কমন সার্ভিস সেন্টারে গিয়ে আজই কার্ড তৈরি করে নিন।
প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা:
আবেদনের জন্য অফিসিয়াল পোর্টালটির নাম মনে রাখুন। ইন্টারনেটে সার্চ করে সহজেই পেয়ে যাবেন। আবেদন সংক্রান্ত যেকোনো সমস্যায় আপনার নিকটস্থ কমন সার্ভিস সেন্টারে (CSC) বা তালিকাভুক্ত হাসপাতালের আয়ুষ্মান মিত্র ডেস্কে যোগাযোগ করতে পারেন।

Leave a Reply
View Comments