পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতীদের জন্য বড় সুখবর। রাজ্যের নতুন সরকার ‘যুব শক্তি প্রকল্প’ (Yuva Shakti Scheme) চালু করতে চলেছে। এই প্রকল্পের আওতায় যোগ্য বেকার যুবক-যুবতীরা প্রতি মাসে ৩,০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা পাবেন। পূর্বতন ‘যুবসাথী’ প্রকল্পে যেখানে ১,৫০০ টাকা দেওয়া হতো, সেখানে এই নতুন প্রকল্পে তা দ্বিগুণ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ১ জুন থেকে এই প্রকল্প কার্যকর হচ্ছে। চলুন জেনে নিই এই প্রকল্পের আবেদনের সম্পূর্ণ পদ্ধতি, যোগ্যতা ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র।
যুব শক্তি প্রকল্প পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একটি বেকার ভাতা সহায়তা প্রকল্প। এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো রাজ্যের শিক্ষিত কিন্তু কর্মহীন যুবক-যুবতীদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করা, যাতে তারা চাকরির প্রস্তুতি, পড়াশোনার খরচ এবং ইন্টারভিউতে যাতায়াতের খরচ মেটাতে পারেন। এই প্রকল্পের আওতায় নির্বাচিত আবেদনকারীদের ‘যুব শক্তি ভরসা কার্ড’ দেওয়া হবে, যা তাদের এই বেকার ভাতা পাওয়ার যোগ্যতা নিশ্চিত করবে।

যুব শক্তি প্রকল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| প্রকল্পের নাম | যুব শক্তি প্রকল্প / যুব শক্তি ভরসা কার্ড |
| চালুর তারিখ | ১ জুন ২০২৬ |
| মাসিক সহায়তা | ৩,০০০ টাকা (পূর্বের যুবসাথীতে ছিল ১,৫০০ টাকা) |
| প্রদান পদ্ধতি | DBT-এর মাধ্যমে সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে |
| আবেদন পোর্টাল চালু | ১ জুন ২০২৬ থেকে |
| পরিচালনাকারী দপ্তর | পশ্চিমবঙ্গ যুব পরিষেবা অধিদপ্তর |
যোগ্যতা: কারা আবেদন করতে পারবেন?
যুব শক্তি প্রকল্পের সুবিধা পেতে হলে নিচের যোগ্যতাগুলি পূরণ করতে হবে:
মৌলিক যোগ্যতা
-
আবাসিক যোগ্যতা: আবেদনকারীকে পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে।
-
বয়সসীমা: আবেদনকারীর বয়স ২১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে হতে হবে।
-
শিক্ষাগত যোগ্যতা: ন্যূনতম মাধ্যমিক (১০ম শ্রেণি) বা সমতুল্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক বা উচ্চতর ডিগ্রিধারীরাও আবেদন করতে পারবেন।
-
বেকারত্ব: আবেদনকারীকে বর্তমানে সম্পূর্ণ বেকার হতে হবে। কোনো সরকারি বা বেসরকারি চাকরিতে কর্মরত থাকলে এই সুবিধা পাওয়া যাবে না।
বিশেষ শর্ত
-
আবেদনকারীর নিজস্ব কোনো ব্যবসা থাকলে এবং সেখান থেকে নির্দিষ্ট আয় হলে তিনি অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।
-
স্থানীয় এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জে নিবন্ধিত থাকা আবশ্যক।
-
যাঁরা পূর্ববর্তী ‘যুবসাথী’ প্রকল্পের সুবিধাভোগী ছিলেন, তাঁদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হবে না। তাঁদের নতুন করে আবেদন করতে হবে।
প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট (নথিপত্র)
আবেদনের সময় নিচের ডকুমেন্টগুলির প্রয়োজন হবে। এগুলো স্ক্যান করে (JPEG বা PDF ফরম্যাটে) রেডি রাখুন:
| ক্রম | নথির নাম | প্রয়োজনীয়তা |
|---|---|---|
| ১ | আধার কার্ড | বাধ্যতামূলক |
| ২ | ভোটার আইডি কার্ড | বাধ্যতামূলক |
| ৩ | মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড (বয়স প্রমাণের জন্য) | বাধ্যতামূলক |
| ৪ | মাধ্যমিক বা সমতুল্য পরীক্ষার মার্কশিট | বাধ্যতামূলক |
| ৫ | উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতার সার্টিফিকেট ও মার্কশিট (যদি থাকে) | প্রযোজ্য ক্ষেত্রে |
| ৬ | ব্যাঙ্ক পাসবুকের প্রথম পৃষ্ঠার কপি (নাম, অ্যাকাউন্ট নম্বর ও IFSC কোডসহ) | বাধ্যতামূলক |
| ৭ | পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি | বাধ্যতামূলক |
| ৮ | সক্রিয় মোবাইল নম্বর | বাধ্যতামূলক |
| ৯ | এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ রেজিস্ট্রেশন নম্বর | বাধ্যতামূলক |
| ১০ | নির্বাচনী পরিচয়পত্র (যদি থাকে) | ঐচ্ছিক কিন্তু ভালো |
গুরুত্বপূর্ণ: টাকা পাওয়ার জন্য ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সঙ্গে আধার কার্ড লিঙ্ক করা (DBT সক্রিয়) বাধ্যতামূলক। এছাড়া জয়েন্ট অ্যাকাউন্টের পরিবর্তে নিজস্ব সিঙ্গেল ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে।
আবেদন পদ্ধতি (ধাপে ধাপে)
যুব শক্তি প্রকল্পে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক। ১ জুন ২০২৬ থেকে আবেদন পোর্টাল চালু হচ্ছে। নিচের ধাপগুলো সাবধানে অনুসরণ করুন:
ধাপ ১: অফিসিয়াল পোর্টালে যান
প্রথমে যুব শক্তি প্রকল্পের অফিসিয়াল পোর্টালে যান। পোর্টালটির নাম মনে রাখুন – এটি ইন্টারনেটে সার্চ করে সহজেই পেয়ে যাবেন। এছাড়া এমপ্লয়মেন্ট ব্যাঙ্কের অফিসিয়াল সাইট থেকেও আবেদনের লিঙ্ক পাওয়া যাবে।
ধাপ ২: নিবন্ধন করুন
পোর্টালে গিয়ে ‘নিবন্ধন’ বা ‘রেজিস্ট্রেশন’ অপশনে ক্লিক করুন। আপনার সক্রিয় মোবাইল নম্বর দিন। ওটিপি (OTP) দিয়ে নম্বর ভেরিফাই করুন এবং একটি পাসওয়ার্ড তৈরি করুন।
ধাপ ৩: আবেদন ফর্ম পূরণ করুন
লগইন করে আবেদন ফর্মটি খুলুন। নিচের তথ্যগুলো সঠিকভাবে দিন:
-
ব্যক্তিগত তথ্য (নাম, পিতার নাম, জন্মতারিখ, স্থায়ী ঠিকানা)
-
শিক্ষাগত যোগ্যতা (পরীক্ষার নাম, বোর্ড, বছর, প্রাপ্ত নম্বর)
-
এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ রেজিস্ট্রেশন নম্বর
-
ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের বিবরণ (অ্যাকাউন্ট নম্বর ও IFSC কোড)
-
বর্তমান বেকারত্বের অবস্থা
সতর্কতা: একবার ফর্ম জমা দিলে সংশোধনের সুযোগ থাকে না। তাই সব তথ্য ডাবল চেক করে নিন।
ধাপ ৪: ডকুমেন্ট আপলোড করুন
পূর্বে রেডি করে রাখা সমস্ত প্রয়োজনীয় নথিপত্র সঠিক জায়গায় আপলোড করুন। নিশ্চিত করুন প্রতিটি ফাইলের সাইজ ও ফরম্যাট সঠিক আছে (সাধারণত ৫০০ কেবি থেকে ১ এমবি-র মধ্যে)।
ধাপ ৫: চূড়ান্ত জমা দিন ও রসিদ সংগ্রহ করুন
সব তথ্য ও ডকুমেন্ট ঠিক থাকলে ‘সাবমিট’ বাটনে ক্লিক করুন। সাবমিট করার পর একটি কনফার্মেশন পেজ দেখাবে। একটি অ্যাপ্লিকেশন আইডি দেওয়া হবে। এই পেজটি প্রিন্ট করে নিন বা PDF সেভ করে রাখুন। ভবিষ্যতে আবেদনের অবস্থা জানতে এই অ্যাপ্লিকেশন আইডির প্রয়োজন হবে।
DBT লিংক যাচাইকরণ (অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ)
যুব শক্তি প্রকল্পের টাকা পেতে DBT (Direct Benefit Transfer) সক্রিয় থাকা বাধ্যতামূলক। টাকা না পাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো DBT লিংক না থাকা।
DBT লিংক যাচাই করার পদ্ধতি:
ধাপ ১: NPCI (National Payments Corporation of India)-এর অফিসিয়াল পোর্টালে যান। পোর্টালটির নাম ইন্টারনেটে সার্চ করে পেয়ে যাবেন।
ধাপ ২: আপনার আধার নম্বর দিন এবং ‘Aadhaar Mapped Status’ চেক করুন।
ধাপ ৩: যদি লিঙ্ক না থাকে, তাহলে অবিলম্বে আপনার ব্যাঙ্ক শাখায় গিয়ে বা অনলাইন ব্যাঙ্কিংয়ের মাধ্যমে ‘Aadhaar Seeding’ সম্পন্ন করুন।
ধাপ ৪: নিশ্চিত করুন যে আপনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টটি সিঙ্গেল অ্যাকাউন্ট (জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট নয়)।
যুবসাথী প্রকল্পের পুরনো সুবিধাভোগীদের জন্য বিশেষ নির্দেশনা
যাঁরা পূর্ববর্তী ‘যুবসাথী’ প্রকল্পের আওতায় মাসিক ১,৫০০ টাকা পেতেন, তাঁদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:
-
স্বয়ংক্রিয় স্থানান্তর হবে না: পুরনো সুবিধাভোগীরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুব শক্তি প্রকল্পের আওতায় চলে আসবেন না। তাঁদের নতুন করে আবেদন করতে হবে।
-
তথ্য পুনর্যাচাই: প্রত্যেক আবেদনকারীর তথ্য ফের যাচাই করা হবে। একই ব্যক্তির একাধিক অ্যাকাউন্টে টাকা পড়ার ঘটনা খতিয়ে দেখা হবে।
-
পৃথক আবেদন বাধ্যতামূলক: পুরনো তালিকায় নাম থাকলেও এই ৩,০০০ টাকার ভাতা পেতে গেলে চাকরিপ্রার্থীদের নতুন করে যুবশক্তি ভরসা কার্ডের জন্য আবেদন জানাতে হবে।
গুরুত্বপূর্ণ তারিখ ও সময়সীমা
| ইভেন্ট | তারিখ |
|---|---|
| প্রকল্প চালু ও পোর্টাল খোলা | ১ জুন ২০২৬ |
| টাকা প্রদান শুরু | ১ জুন ২০২৬ থেকে |
| আবেদনের শেষ তারিখ | এখনও ঘোষিত হয়নি (দ্রুত আবেদন করুন) |
সতর্কতা: ১ জুনের আগেই আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে DBT লিংক নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যাতে প্রথম মাস থেকেই টাকা পাওয়া যায়। যদি ১ জুনের পরে আবেদন করেন, তাহলে সেদিন থেকে টাকা পাওয়া যাবে, পূর্ববর্তী মাসের জন্য নয়।
আবেদনের অবস্থা যাচাইকরণ
একবার আবেদন জমা দেওয়ার পর আপনি অনলাইনে আপনার আবেদনের অবস্থা যাচাই করতে পারবেন:
-
অফিসিয়াল পোর্টালে লগইন করুন
-
‘ট্র্যাক অ্যাপ্লিকেশন’ বা ‘আবেদনের অবস্থা’ অপশনে ক্লিক করুন
-
আপনার অ্যাপ্লিকেশন আইডি ও জন্মতারিখ দিন
-
স্ক্রিনে আপনার আবেদনের বর্তমান অবস্থা দেখতে পাবেন
আবেদনের অবস্থা বিভিন্ন রকম হতে পারে:
-
Pending: আবেদন জমা পড়েছে, যাচাইকরণ চলছে
-
Verified: আবেদন যাচাইকৃত হয়েছে
-
Approved: আবেদন অনুমোদিত হয়েছে, টাকা আসতে পারে
-
Rejected: আবেদন বাতিল হয়েছে (কারণসহ দেখাবে)
-
Payment Done: টাকা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়েছে
সতর্কীকরণ ও পরামর্শ
-
কোনো আবেদন ফি নেই: যুব শক্তি প্রকল্পে আবেদন করতে কোনো টাকা লাগে না। কেউ টাকা চাইলে জালিয়াতি বুঝবেন এবং সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাবেন।
-
সঠিক তথ্য দিন: শিক্ষাগত যোগ্যতা বা বেকারত্ব নিয়ে কোনো মিথ্যা তথ্য দিলে আবেদন বাতিল হবে এবং ভবিষ্যতের জন্যও অযোগ্য ঘোষণা করা হতে পারে।
-
DBT লিংক নিশ্চিত করুন: টাকা পাওয়ার জন্য ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট আধারের সঙ্গে লিঙ্ক করা আবশ্যক। ১ জুনের আগেই এটি করে রাখুন।
-
একাধিক আবেদন নয়: একই ব্যক্তি একাধিকবার আবেদন করলে সব আবেদন বাতিল হবে।
-
এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জে নিবন্ধন: আবেদনের আগে স্থানীয় এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জে নিবন্ধিত হয়ে নিন। নিবন্ধন না থাকলে আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে না।
-
ভুয়া ওয়েবসাইট থেকে সাবধান: শুধুমাত্র অফিসিয়াল পোর্টালে আবেদন করুন। অননুমোদিত ওয়েবসাইট বা ভুয়ো রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত দাবির উপর ভরসা করবেন না।
-
মোবাইল নম্বর সক্রিয় রাখুন: যাবতীয় তথ্য ও ওটিপি আসবে আপনার মোবাইলে। তাই নম্বরটি সব সময় সক্রিয় রাখুন।
উপসংহার:
যুব শক্তি প্রকল্প ২০২৬ পশ্চিমবঙ্গের বেকার যুবক-যুবতীদের জন্য এক যুগান্তকারী সুযোগ। মাসিক ৩,০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা চাকরিপ্রার্থীদের পড়াশোনার খরচ, পরীক্ষার প্রস্তুতি এবং ইন্টারভিউতে যাতায়াতের খরচ মেটাতে বড় ভূমিকা রাখবে। ১ জুন ২০২৬ থেকে আবেদন পোর্টাল খুলছে।
আপনি যদি যুবসাথী প্রকল্পের পুরনো সুবিধাভোগীও হন, তবে মনে রাখবেন – নতুন করে আবেদন করা বাধ্যতামূলক। স্বয়ংক্রিয় স্থানান্তর হবে না।
সুতরাং, আর দেরি না করে আপনার প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টগুলি সংগ্রহ করুন, এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জে নিবন্ধন করুন, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট DBT লিংক নিশ্চিত করুন এবং ১ জুন থেকে অফিসিয়াল পোর্টালে গিয়ে আবেদন করুন।
প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা:
আবেদনের জন্য অফিসিয়াল পোর্টালটির নাম মনে রাখুন – এটি ইন্টারনেটে সার্চ করে সহজেই পেয়ে যাবেন। আবেদন সংক্রান্ত যেকোনো সমস্যায় রাজ্য সরকারের যুব পরিষেবা অধিদপ্তরের হেল্পলাইন নম্বরে যোগাযোগ করতে পারেন। হেল্পলাইন নম্বরটি অফিসিয়াল পোর্টাল চালু হওয়ার পর পাওয়া যাবে।

Leave a Reply
View Comments