পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কৃষি ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় প্রকল্প হলো ‘কৃষক বন্ধু প্রকল্প’ (Krishak Bandhu Scheme)। এই প্রকল্পের মাধ্যমে রাজ্যের কৃষক ও কৃষিজীবী মানুষদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। ২০২৬ সালে এই প্রকল্পে বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এবার থেকে ভূমিহীন কৃষি শ্রমিকরা (যাঁদের নিজস্ব কোনো চাষের জমি নেই) তাঁরাও এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন। চলুন জেনে নিই কে কত টাকা পাবেন, কীভাবে আবেদন করবেন এবং কী কী নথি প্রয়োজন।
কৃষক বন্ধু প্রকল্প কী?
কৃষক বন্ধু প্রকল্প পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একটি কৃষক কল্যাণমূলক স্কিম। এই প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য হলো কৃষকদের চাষাবাদের খরচ জোগাতে আর্থিক সাহায্য করা এবং কোনো কৃষকের অকাল মৃত্যু হলে তাঁর পরিবারকে আর্থিক সুরক্ষা প্রদান করা।
প্রকল্পটি মূলত দুটি অংশে বিভক্ত:
-
কৃষক বন্ধু আয় সহায়তা স্কিম: কৃষকদের বার্ষিক আর্থিক অনুদান প্রদান
-
কৃষক বন্ধু মৃত্যু সহায়তা স্কিম: কৃষকের মৃত্যুতে পরিবারকে এককালীন ২ লক্ষ টাকা

কারা কত টাকা পাবেন? (সুবিধার পরিমাণ)
২০২৬ সালে প্রকল্পটির পরিধি আরও বাড়ানো হয়েছে। এবার দুই ধরনের মানুষের জন্য আলাদা সুবিধা নির্ধারণ করা হয়েছে:
১. জমির মালিক কৃষক
যাঁদের নিজস্ব চাষযোগ্য জমি আছে, তাঁরা জমির পরিমাণ অনুযায়ী আর্থিক সহায়তা পাবেন:
| জমির পরিমাণ | বার্ষিক সহায়তা |
|---|---|
| ১ একর বা তার বেশি | ১০,০০০ টাকা |
| ১ একরের কম | আনুপাতিক হারে (ন্যূনতম ৪,০০০ টাকা) |
২. ভূমিহীন কৃষি শ্রমিক (২০২৬-এ নতুন সংযোজন)
এবার থেকে যাঁদের নিজস্ব কোনো চাষের জমি নেই এবং যাঁরা অন্যদের জমিতে কাজ করেন, তাঁরা প্রতি বছর ৪,০০০ টাকা পাবেন। এই অর্থ দুই কিস্তিতে দেওয়া হবে:
-
প্রথম কিস্তি (রবি মরশুম): ২,০০০ টাকা
-
দ্বিতীয় কিস্তি (খরিফ মরশুম): ২,০০০ টাকা
৩. মৃত্যু সহায়তা (সকলের জন্য)
১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী কোনো কৃষকের মৃত্যু ঘটলে তাঁর আইনগত উত্তরাধিকারীকে এককালীন ২ লক্ষ টাকা দেওয়া হবে। এর জন্য কৃষকদের কোনো প্রিমিয়াম দিতে হয় না।
যোগ্যতা: কারা আবেদন করতে পারবেন?
আবেদনের যোগ্যতা নির্ভর করে আপনি কোন ক্যাটাগরিতে পড়ছেন তার ওপর:
জমির মালিক কৃষকদের জন্য
-
পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে
-
নিজস্ব চাষযোগ্য জমির মালিক হতে হবে
-
জমির বৈধ প্রমাণপত্র থাকতে হবে (পর্চা/পাট্টা)
-
জমি চাষের উপযোগী হতে হবে
ভূমিহীন কৃষি শ্রমিকদের জন্য (নতুন নিয়ম)
-
পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে
-
নিজস্ব কোনো চাষযোগ্য জমি থাকবে না
-
বর্গা চাষি (Sharecropper) হিসেবে নিবন্ধিত থাকা যাবে না
-
কৃষি শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে হবে
-
প্রধান উপার্জনক্ষম সদস্য হতে হবে
প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট (নথিপত্র)
আবেদনের সময় নিচের ডকুমেন্টগুলির প্রয়োজন হবে:
| ক্রম | নথির নাম | প্রয়োজনীয়তা |
|---|---|---|
| ১ | আধার কার্ড | বাধ্যতামূলক |
| ২ | ভোটার কার্ড | বাধ্যতামূলক |
| ৩ | ব্যাঙ্ক পাসবুকের প্রথম পৃষ্ঠার কপি | বাধ্যতামূলক (DBT-র জন্য) |
| ৪ | আধার ও ব্যাঙ্কের সঙ্গে লিঙ্ক করা মোবাইল নম্বর | বাধ্যতামূলক |
| ৫ | পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি | বাধ্যতামূলক |
| ৬ | জমির প্রমাণপত্র (পর্চা/পাট্টা) | শুধু জমির মালিকদের জন্য |
| ৭ | জমির খাজনার রশিদ | শুধু জমির মালিকদের জন্য (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) |
| ৮ | স্ব-ঘোষণাপত্র (Self-declaration) | শুধু ভূমিহীন কৃষি শ্রমিকদের জন্য |
| ৯ | পঞ্চায়েত/ব্লক থেকে প্রাপ্ত ভূমিহীন শংসাপত্র | শুধু ভূমিহীন কৃষি শ্রমিকদের জন্য |
| ১০ | আধার তথ্য ব্যবহারের সম্মতিপত্র | বাধ্যতামূলক |
আবেদন পদ্ধতি (ধাপে ধাপে)
কৃষক বন্ধু প্রকল্পে আবেদন সম্পূর্ণ অফলাইন পদ্ধতিতে করা হয়। অনলাইনে আবেদনের কোনো ব্যবস্থা নেই। নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন:
ধাপ ১: আবেদন ফর্ম সংগ্রহ করুন
-
আপনার নিকটস্থ ‘দুয়ারে সরকার’ ক্যাম্প বা ‘স্বনির্ভর বাংলা’ ক্যাম্প থেকে আবেদন ফর্ম সংগ্রহ করুন।
-
অথবা, স্থানীয় বাংলা সহায়তা কেন্দ্র (BSK) বা ব্লক কৃষি আধিকারিকের দপ্তরে (ADA Office) গিয়ে ফর্ম নিন।
-
কিছু ক্ষেত্রে গ্রাম পঞ্চায়েত অফিস থেকেও ফর্ম পাওয়া যায়।
ধাপ ২: ফর্ম পূরণ করুন
ফর্মটি সঠিকভাবে পূরণ করার সময় নিচের বিষয়গুলি খেয়াল রাখুন:
-
আধার কার্ডের বানানের সঙ্গে হুবহু মিলিয়ে নাম লিখুন
-
ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নম্বর ও IFSC কোড সঠিকভাবে দিন
-
জমির পরিমাণ (যদি থাকে) স্পষ্টভাবে উল্লেখ করুন
-
ভূমিহীন হলে সেই সংক্রান্ত ঘোষণা সঠিকভাবে দিন
-
মোবাইল নম্বরটি সক্রিয় আছে কিনা নিশ্চিত করুন
ধাপ ৩: প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট সংযুক্ত করুন
ফর্মের সঙ্গে সমস্ত ডকুমেন্টের জেরক্স কপি পিন দিয়ে আটকে দিন। প্রতিটি কপির নিচে নিজের নাম ও তারিখ লিখে স্বাক্ষর করুন (সেলফ অ্যাটেস্টেশন)।
ধাপ ৪: ফর্ম জমা দিন
পূর্ণাঙ্গ ফর্মটি নিচের যেকোনো জায়গায় জমা দিন:
-
‘দুয়ারে সরকার’ ক্যাম্প (নির্ধারিত তারিখে)
-
‘স্বনির্ভর বাংলা’ ক্যাম্প
-
বাংলা সহায়তা কেন্দ্র (BSK)
-
ব্লক কৃষি আধিকারিকের দপ্তর
-
গ্রাম পঞ্চায়েত অফিস
ধাপ ৫: রসিদ সংগ্রহ করুন
ফর্ম জমা দেওয়ার সময় আধিকারিকের কাছ থেকে একটি স্বীকৃতি রসিদ (Acknowledgement Slip) নিয়ে নিন। এই রসিদে একটি অ্যাপ্লিকেশন আইডি থাকবে, যার মাধ্যমে পরে আবেদনের অবস্থা যাচাই করতে পারবেন। রসিদটি নিরাপদে রাখুন।
যাচাইকরণ ও অনুমোদন প্রক্রিয়া
-
ফর্ম জমা দেওয়ার পর কৃষি দপ্তরের সহকারী আধিকারিক ডকুমেন্টগুলি যাচাই করবেন।
-
প্রয়োজনে জমির ফিল্ড পরিদর্শন করা হতে পারে।
-
ভূমিহীন দাবি যাচাইয়ে স্থানীয় পঞ্চায়েতের সহায়তা নেওয়া হবে।
-
যাচাই সফল হলে আবেদন অনুমোদিত হবে।
-
অনুমোদনের পর টাকা সরাসরি DBT-র মাধ্যমে আপনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা হবে।
আবেদনের অবস্থা যাচাইকরণ
একবার আবেদন জমা দেওয়ার পর আপনি অনলাইনে আপনার আবেদনের অবস্থা যাচাই করতে পারবেন:
-
অফিসিয়াল পোর্টালে যান (পোর্টালটির নাম ইন্টারনেটে সার্চ করে পেয়ে যাবেন)
-
‘Track Application’ বা ‘আবেদনের অবস্থা’ অপশনে ক্লিক করুন
-
আপনার প্রাপ্ত অ্যাপ্লিকেশন আইডি ও জন্মতারিখ দিন
-
স্ক্রিনে আপনার আবেদনের বর্তমান অবস্থা (Pending, Verified, Approved, Payment Done) দেখতে পাবেন
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও সতর্কীকরণ
-
কোনো আবেদন ফি নেই: এই প্রকল্পে আবেদন করতে কোনো টাকা লাগে না। এটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। কেউ টাকা চাইলে জালিয়াতি বুঝবেন।
-
প্রকাশিত সময়সীমা: স্বনির্ভর বাংলা ক্যাম্পে আবেদন গ্রহণের জন্য ফেব্রুয়ারি মাসে সময়সীমা নির্ধারিত ছিল। কিন্তু ক্যাম্প পরবর্তী সময়েও অন্যান্য কেন্দ্রের মাধ্যমে আবেদন নেওয়া হয়। তাই দ্রুত আবেদন করা উত্তম।
-
সঠিক তথ্য দিন: জমির পরিমাণ বা আয় নিয়ে কোনো প্রকার মিথ্যা তথ্য দিলে আবেদন বাতিল হবে এবং ভবিষ্যতের জন্যও অযোগ্য ঘোষণা করা হতে পারে।
-
ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সক্রিয় রাখুন: টাকা পাওয়ার জন্য ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট আধারের সঙ্গে লিঙ্ক করা থাকা বাধ্যতামূলক।
-
মোবাইল নম্বর সক্রিয় রাখুন: আধারের সঙ্গে লিঙ্ক করা মোবাইল নম্বর সক্রিয় রাখুন, কারণ ওটিপি ও এসএমএস সেই নম্বরেই আসবে।
-
একাধিক আবেদন নয়: একই ব্যক্তি একাধিকবার আবেদন করলে সব আবেদন বাতিল হবে।
-
প্রতি বছর নতুন করে আবেদন: এই প্রকল্পে সাধারণত প্রতি বছর নতুন করে আবেদনের প্রয়োজন হয় না, তবে সরকারের নির্দেশিকা অনুযায়ী সময়ে সময়ে তথ্য আপডেট করতে হতে পারে।
কৃষক বন্ধু প্রকল্পের সুবিধা ও প্রয়োজনীয়তা
| সুবিধা | বিবরণ |
|---|---|
| আর্থিক সহায়তা | চাষের খরচ মেটাতে বার্ষিক আর্থিক সাহায্য |
| মৃত্যু সহায়তা | অকাল মৃত্যুতে পরিবার পায় ২ লক্ষ টাকা |
| প্রিমিয়াম ছাড়া বীমা | কোনো প্রিমিয়াম ছাড়াই মৃত্যু বীমা সুবিধা |
| কিস্তিতে টাকা | বছরে দুবার কিস্তিতে টাকা দেওয়া হয় |
| সরাসরি ব্যাঙ্কে টাকা | DBT-র মাধ্যমে জালিয়াতির সুযোগ কম |
উপসংহার:
কৃষক বন্ধু প্রকল্প ২০২৬ পশ্চিমবঙ্গের কৃষক ও কৃষিজীবী মানুষদের জন্য এক যুগান্তকারী সুযোগ। বিশেষ করে এই বছর ভূমিহীন কৃষি শ্রমিকদেরও প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছে, যা সত্যিই প্রশংসনীয়। জমির মালিক কৃষকরা বছরে ১০,০০০ টাকা পাচ্ছেন, আর ভূমিহীন শ্রমিকরা পাচ্ছেন ৪,০০০ টাকা। সব মিলিয়ে এই প্রকল্প রাজ্যের কৃষি ক্ষেত্রে এক বড় ভূমিকা রাখছে।
সুতরাং, আর দেরি না করে আপনার প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টগুলি সংগ্রহ করুন। নিকটস্থ দুয়ারে সরকার ক্যাম্প, বাংলা সহায়তা কেন্দ্র বা ব্লক কৃষি দপ্তরে গিয়ে ফর্ম জমা দিন। আর্থিক সহায়তা নিয়ে নিজের ও পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ুন।
প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা:
আবেদন ফর্ম ডাউনলোড ও অন্যান্য তথ্যের জন্য অফিসিয়াল পোর্টালটির নাম মনে রাখুন। এটি ইন্টারনেটে সার্চ করে সহজেই পেয়ে যাবেন। আবেদন সংক্রান্ত যেকোনো সমস্যায় আপনার নিকটস্থ ব্লক কৃষি দপ্তর, বাংলা সহায়তা কেন্দ্র বা গ্রাম পঞ্চায়েত অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন।

Leave a Reply
View Comments