অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার অর্থ বিতরণ শুরু: ২৮ লক্ষ মহিলার অ্যাকাউন্টে সরাসরি এলো ৩,০০০ টাকা

Annapurna Bhandar Payment Receive ₹3,000 Directly in Bank Accounts

পশ্চিমবঙ্গের মহিলাদের জন্য বড় খবর। রাজ্যের নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার যোজনা (Annapurna Bhandar Yojana) চূড়ান্তভাবে কার্যকর হয়েছে। ৩রা জুন, ২০২৬ তারিখে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রকল্পের সূচনা করেন এবং প্রথম পর্যায়ে প্রায় ২৮ লক্ষ ২৫ হাজার ৭৬৯ জন মহিলার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ৩,০০০ টাকা করে সরাসরি পাঠানো হয়েছে।

লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের স্থলাভিষিক্ত হয়ে এই নতুন প্রকল্পটি চালু হলো। চলুন জেনে নেওয়া যাক এই অর্থ বিতরণের পুরো প্রক্রিয়া, কারা এই সুবিধা পেয়েছেন এবং কীভাবে আপনি আপনার টাকার অবস্থা যাচাই করবেন।

জেলাভিত্তিক সুবিধাভোগীর সংখ্যা

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে ২৮,২৫,৭৬৯ জন মহিলা এই প্রকল্পের আওতায় এসেছেন। নিচে জেলাভিত্তিক সুবিধাভোগীর সংখ্যার তালিকা দেওয়া হলো:

জেলার নাম সুবিধাভোগীর সংখ্যা
নদিয়া ২,৫৯,৯৫৫
মুর্শিদাবাদ ২,১৯,৩৭৩
পশ্চিম মেদিনীপুর ২,১৭,৮৫৬
উত্তর ২৪ পরগনা ২,০৫,০০১
পূর্ব মেদিনীপুর ২,০৩,১৮৪
পূর্ব বর্ধমান ১,৯৩,০৯৫
দক্ষিণ ২৪ পরগনা ১,৭৯,০৬৯
হুগলি ১,৫৬,৪০০
বাঁকুড়া ১,৫৫,৪৬৯
মালদহ ১,৩৭,২৭৩
পুরুলিয়া ১,৩৬,৭৬৬
কোচবিহার ১,০৪,৫৬৮
হাওড়া ৯১,৪৫৭
জলপাইগুড়ি ৮৬,২৬৫
বীরভূম ৮২,০৯৫
উত্তর দিনাজপুর ৬৯,৩২৯
ঝাড়গ্রাম ৫৬,১০৭
পশ্চিম বর্ধমান ৫৫,২৪২
আলিপুরদুয়ার ৫১,৪৫১
দক্ষিণ দিনাজপুর ৪৯,৩২৭
কলকাতা ২৩,৮০৭

উপরের তালিকা থেকে দেখা যাচ্ছে, নদিয়া জেলায় সর্বাধিক ২,৫৯,৯৫৫ জন মহিলা এই প্রথম পর্যায়ে সুবিধা পেয়েছেন। তারপরে রয়েছে মুর্শিদাবাদ (২,১৯,৩৭৩) ও পশ্চিম মেদিনীপুর (২,১৭,৮৫৬)।

Annapurna Bhandar Payment Receive ₹3,000 Directly in Bank Accounts

কী পরিমাণ টাকা দেওয়া হয়েছে এবং কাদের দেওয়া হয়েছে?

৩রা জুন, ২০২৬-এ নবান্নে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, প্রথম দফায় ২৮,২৫,৭৬৯ জন মহিলার অ্যাকাউন্টে ৩,০০০ টাকা করে টাকা পাঠানো হয়েছে

মজার বিষয় হলো, গত ২৭শে মে ফর্ম বিতরণ শুরু হওয়ার মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই লক্ষ লক্ষ মহিলার আবেদন যাচাই করে এই টাকা দেওয়া সম্ভব হয়েছে। আবেদনকারীদের সঙ্গে নিয়ে যাতে কোনো প্রকার বৈষম্য না হয়, সেজন্য রাজ্য সরকার পঞ্চায়েত, পুরসভা এবং বিডিও অফিসের মাধ্যমে ঘরে ঘরে গিয়ে ফর্ম পূরণে সাহায্য করছে।

কারা এই অর্থ পাবেন না? (অযোগ্যতার শর্ত)

সবাই এই ৩,০০০ টাকা পাচ্ছেন না। সরকার কিছু নির্দিষ্ট মানদণ্ড স্থির করেছে। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দিয়েছেন, যাদের নাম নির্বাচনী তালিকার বিশেষ সংশোধনী (SIR) প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তারা এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন না।

এছাড়া নিচের ব্যক্তিরাও এই প্রকল্পের আওতার বাইরে থাকবেন:

  • যাঁরা স্থায়ী সরকারি চাকরিজীবী (কেন্দ্র বা রাজ্য)

  • যাঁরা নিয়মিত পেনশন পান

  • যাঁরা আয়কর দেন

  • রাজ্য সরকার অনুমোদিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীরা

  • যাঁরা ভোটার তালিকা থেকে মৃত, স্থানান্তরিত বা নকল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন

  • যাঁরা পূর্ববর্তী প্রকল্পে একাধিক অ্যাকাউন্টে টাকা নেওয়ার অভিযোগে চিহ্নিত হয়েছেন

তবে কিছু বিশেষ ছাড় রয়েছে: যাঁরা সিআরপিএফের আওতায় ধর্মীয় নিপীড়ন থেকে পালিয়ে আসা হিন্দু শরণার্থী, অথবা যাঁদের নাগরিকত্ব নিয়ে মামলা আদালতে বিচারাধীন, তাঁরা এই বৃত্তি পেতে পারেন।

পুরনো লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের সুবিধাভোগীরা কী অবস্থায় আছেন?

যাঁরা ইতিমধ্যে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছিলেন, তাঁদের নিয়ে চিন্তার কোনো কারণ নেই। সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে পুরনো সুবিধাভোগীদের তথ্য যাচাই করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে (Automatically Migrate) অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্পে স্থানান্তরিত করা হবে। তবে তথ্য যাচাই না হওয়া পর্যন্ত পুরনো প্রকল্পটি আগের মতো চলতে থাকবে।

মুখ্যমন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, পুরনো সুবিধাভোগীদের তথ্য পুনর্যাচাই করা হচ্ছে। কেউ যদি একাধিক অ্যাকাউন্টে টাকা নিয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কীভাবে বুঝবেন আপনার অ্যাকাউন্টে টাকা এসেছে?

আপনি নিচের সহজ উপায়গুলির মাধ্যমে জেনে নিতে পারেন আপনার অ্যাকাউন্টে টাকা জমা হয়েছে কিনা:

১. সরাসরি ব্যাঙ্ক চেক করুন: আপনার মোবাইল ব্যাঙ্কিং অ্যাপ, ইন্টারনেট ব্যাঙ্কিং লগইন করে অথবা নিকটস্থ এটিএম গিয়ে ব্যালেন্স চেক করে দেখুন।

২. পাসবুক আপডেট করুন: ব্যাঙ্কে গিয়ে আপনার অ্যাকাউন্টের পাসবুক আপডেট করিয়ে নিলে লেনদেনের বিবরণ দেখতে পাবেন।

৩. হেল্পলাইনে যোগাযোগ করুন: সরকার এই প্রকল্পের জন্য একটি বিশেষ হেল্পলাইন নম্বর চালু করেছে। সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে হেল্পলাইনে ফোন করে সাহায্য নেওয়া যাবে। এছাড়া ইমেলের মাধ্যমেও যোগাযোগ করা যাবে।

টাকা না পেলে করণীয়?

অনেকের অ্যাকাউন্টে হয়তো এখনও টাকা আসেনি। এর পেছনে প্রধান কারণ হলো DBT (Direct Benefit Transfer) লিংক না থাকা। অর্থাৎ আপনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টটি যদি আধার কার্ডের সঙ্গে লিঙ্ক না করা থাকে, তাহলে টাকা আসবে না। সেক্ষেত্রে দ্রুত ব্যাঙ্কে গিয়ে আধার সিডিং করিয়ে নিন।

টাকা না পাওয়ার অন্যান্য কারণ:

  • আপনার নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে

  • আপনার আয়কর দেবার নথি জমা পড়েনি

  • আপনার ফর্মে তথ্য ভুল ছিল

  • আপনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট

এক্ষেত্রে দ্রুত আপনার নিকটস্থ পঞ্চায়েত অফিস বা ব্লক অফিসে যোগাযোগ করুন। তারাও নতুন আবেদনকারীদের তথ্য যাচাই করতে কিছুটা সময় নিচ্ছে।

নতুন আবেদনকারীদের জন্য নির্দেশনা

যাঁরা এখনও আবেদন করেননি, তাঁদের জন্য সুখবর। প্রকল্পটির আবেদনের জন্য মোট ৯০ দিন সময় বরাদ্দ রয়েছে। তাই দেরি না করে দ্রুত আপনার নিকটস্থ পঞ্চায়েত অফিস, পুরসভা অফিস বা বিডিও অফিসে গিয়ে আবেদন ফর্ম সংগ্রহ করুন।

আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট:

  • আধার কার্ড

  • ভোটার আইডি কার্ড

  • রেশন কার্ড

  • ব্যাঙ্ক পাসবুকের কপি (আধারের সঙ্গে লিঙ্ক করা)

  • পাসপোর্ট সাইজের ছবি

  • সক্রিয় মোবাইল নম্বর

উপসংহার

অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্প পশ্চিমবঙ্গের মহিলাদের আর্থিক স্বনির্ভরতার পথে একটি বড় পদক্ষেপ। মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সময়মতো টাকা দেওয়া শুরু হয়েছে। নদিয়া জেলায় সর্বাধিক ২,৫৯,৯৫৫ জন মহিলা এই সুবিধা পেয়েছেন। যাঁরা এখনও ফর্ম জমা দেননি, তাঁদের জন্য আগামী ৯০ দিন আবেদনের সময় থাকছে। তাই দেরি না করে দ্রুত আপনার নিকটস্থ পঞ্চায়েত অফিস বা ব্লক অফিসে যোগাযোগ করে ফর্ম পূরণ করুন।

প্রথম পর্যায়ে ২৮ লক্ষের বেশি মহিলা এই সুবিধা পেয়েছেন। আগামী দিনে বাকি আবেদনকারীদের টাকা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলবে।

প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা:
টাকা পেতে আধার ও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট লিঙ্ক করা বাধ্যতামূলক। কোনো ধরনের আবেদন ফি নেই, তাই কেউ টাকা চাইলে সাবধান। প্রয়োজনে সরকারি হেল্পলাইনে যোগাযোগ করুন। বাংলার প্রতিটি মহিলার কাছে পৌঁছে দেওয়াই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।